ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড (BOE) – যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক

নামে ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড হলেও, এই কেন্দ্রীয় ব্যাংকটি আসলে যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থাৎ, শুধু ইংল্যান্ডের নয়, বরং এটি স্কটল্যান্ড, ওয়েলস এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডেরও কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

BOE কিন্তু অনেক আগে প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই ১৬৯৪ সালে। বয়সের দিক থেকে এটি বিশ্বের অষ্টম প্রাচীন ব্যাংক। সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক Sveriges Riksbank এর পরে এটি বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যেটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বোঝায় যাচ্ছে যে, বিশ্বের প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে BOE ই সবচেয়ে পুরনো। ব্যাংকটির বর্তমান সদরদপ্তরও অনেক পুরনো। সেই, ১৭৩৪ সাল থেকে লন্ডনে একই জায়াগায় রয়েছে।

উন্নত অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মত মূলত ঐতিহাসিক সংকটকালীন সময়ে সংকটের মোকাবিলা করার জন্যই ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৬৯০ সালে ফ্রান্সের সাথে যুদ্ধে ইংল্যান্ডের চরম পরাজয়ের পর দেশটির নৌবাহিনীকে ঢেলে সাজানোর জন্য যে বিপুল পরিমান অর্থের প্রয়োজন হয়, তা দেশটির সরকারের কাছে ছিল না। এমনকি সেই পরিমান অর্থ লোন নেওয়ার মত প্রয়োজনীয় ক্রেডিট ও সরকারের হাতে ছিল না। মূলত সেই পরিপেক্ষিতেই ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং ব্যাংকটিকে ব্যাংকনোট ইস্যু করার একমাত্র ক্ষমতা দেয়া হয়। যে পরিমান পাউন্ড সংগ্রহকে সামনে রেখে তৎকালীন সরকার BOE প্রতিষ্ঠা করে, মাত্র ১২ দিনে তা সংগ্রহ করা সম্ভব হয় (১.২ মিলিয়ন পাউন্ড)।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে ব্যাংকটির মালিকানা প্রাইভেট শেয়ারহোল্ডারদের কাছে থাকলেও ১৯৪৬ সালে এসে এটিকে জাতীয়করন করা হয়। আর ১৯৯৮ সালে স্বাধীন সরকারী সংস্থাতে রুপান্তরিত করা হয়। এর ফলে ব্যাংকটির মালিকানা সরকারের ট্রেজারী সলিসিটরের কাছে থাকলেও মনেটারি পলিসি প্রনয়নের ব্যাপারে ব্যাংকটি সম্পূর্ণ স্বাধীন।

মজার বিষয় হচ্ছে সমগ্র যুক্তরাজ্যে মোট আটটি ব্যাংক পাউন্ড ব্যাংকনোট ইস্যু করতে পারে, যেটি অনেকে দেশ থেকে ব্যতিক্রম। কারন, অধিকাংশ দেশে শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক নোট ইস্যু করতে পারে। BOE ও এই আটটি ব্যাংকের একটি, তবে পার্থক্য হচ্ছে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে BOE তার ইচ্ছেমত ব্যাংকনোট ইস্যু করতে পারে এবং স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যে ব্যাংকনোট ইস্যু করে, সেগুলোর তদারকও করতে পারে।

ব্যাংক অফ ইংল্যান্ডের কাজঃ

BOE এর কাজ আর সব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতই, যেমনঃ পাউন্ড ব্যাংকনোট ইস্যু করা, সুদের হার ঠিক করা, মনেটারি পলিসির দেখভাল করা। ব্যাংকটি যুক্তরাজ্য সরকারের ঋন পাওয়ার শেষ অবলম্বনও বটে। উল্লেখ্য যে, BOE, যুক্তরাজ্য ও আরও ৩০ টি দেশের গোল্ড রিজার্ভের জিম্মাদার। ২০১৬ সালে ব্যাংকটির কাছে সংরক্ষিত মোট স্বর্ণের পরিমান ছিল ৫ হাজার টনেরও বেশি, যেটা মানবজাতি আজ পর্যন্ত যত স্বর্ণ উত্তোলন করেছে, তার প্রায় ৩ শতাংশ।

তবে, ব্যাংকটির মূল কার্যক্রমকে দুইভাগে ভাগ করা যায়ঃ

  • মনেটারি স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, যেমনঃ দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা, পাঊন্ডের প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখা ইত্যাদি। দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য, অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মতই BOE সুদের হার নিয়ন্ত্রন করে মূল্যস্ফীতিকে একটি নির্দিস্ট পর্যায়ে রাখতে চেস্টা করে।
  • সম্পদ ক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করা – ২০০৯ সাল থেকে ব্যাংকটি অ্যাসেট পারচেজ বা সম্পদ ক্রয় কার্যক্রম চালু করেছে যাতে ভালো মানের সম্পদ ক্রয় করে ক্রেডিট মার্কেটে তারল্য বৃদ্ধি করা যায়। এর ফলে বিভিন্ন আর্থিক সংস্থা তাদের হাতে থাকা বিভিন্ন প্রপার্টিজ BOE এর কাছে বিক্রির মাধ্যমে প্রয়োজনের সময় অর্থের সংকুলান করতে পারবে।

BOE এর মনেটারি পলিসি কমিটি

ব্যাংক অফ ইংল্যান্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কমিটি হল BOE এর গভর্নরের নেতৃত্বে গঠিত ৯ সদস্যবিশিষ্ট মনেটারি পলিসি কমিটি। মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ঠিকমত পূরণ হচ্ছে কিনা এবং সে উদ্দেশ্যে সুদের হারের পলিসি কি হবে, তা নিয়ে প্রতি মাসে একবার করে বৈঠকে বসে এই কমিটি। কমিটির ৯ সদস্যের প্রত্যেকেরই একটি করে ভোটিং ক্ষমতা রয়েছে, তারাই ভোটিং এঁর মাধ্যমে সুদের হার কমায় বা বৃদ্ধি করে অথবা অপরিবির্তিত রাখে। ২০০৮ সালের অক্টোবরে অর্থনৈতিক মন্দার সময় BOE এর সুদের হার ছিল ৫ শতাংশ, যেটাকে মাত্র ৫ মাসের ব্যবধানে এই কমিটি ০.৫ শতাংশে নামিয়ে নিয়ে আসে। ফরেক্স ট্রেডারদের কাছে তাই এই কমিটির মাসিক বৈঠক বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

এক নজরে BOE

নামঃ Bank of England বা সংক্ষেপে BOE
সদরদপ্তরঃ লন্ডন, যুক্তরাজ্য
প্রতিষ্ঠাকালঃ ২৭ জুলাই, ১৬৯৪
বর্তমান প্রেসিডেন্টঃ মার্ক কার্নি (কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ব্যাংক অফ কানাডার প্রাক্তন গভর্নর)
রিজার্ভঃ ৪০৮ বিলিয়ন পাউন্ড
অন্যান্যঃ যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যুক্তরাজ্যের আরও সাতটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের পাশাপাশি পাউন্ড ইস্যু করতে পারে।
ওয়েবসাইটঃ http://www.bankofengland.co.uk/

হোম
নিউজ
ট্রেডিং স্কুল
ব্রোকার
সিগন্যাল
ক্লাব
Scroll to Top