1 of 2

ইসিবি কি? ফরেক্স মার্কেটে ইসিবির প্রভাবই বা কি?

কোন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি এতটাই অসহায় হয় যে, তার কোন কারেন্সি ছাপানোর ক্ষমতা থাকবে না, সুদের হার নির্ধারনের ক্ষমতা থাকবে না, এমনকি সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপর সম্পূর্ন নিয়ন্ত্রনও থাকবে না, তাহলে কি তাকে আদৌ কোন কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলা যায়? মজার বিষয় হল, বিশ্বের অনেক শক্তিশালী দেশ, যেমন – জার্মানী, ফ্রান্সের নিজস্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কিন্তু এর কোনটাই করতে পারে না। তাহলে এসব দেশের কারেন্সি ছাপা বা সুদের হার নিয়ন্ত্রন করার দায়িত্বটা কার?

সোজা বাংলায় এর উত্তর হচ্ছে ইউরোপিয়ান কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যার ইংরেজি নাম হচ্ছে ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক বা সংক্ষেপে ইসিবি (ECB)। কারন ,উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত ১৯ টি দেশ মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে একক কারেন্সি হিসেবে তারা ইউরো ব্যবহার করবে। আর কারেন্সি যেহেতু এখন ১৯ টির বদলে মাত্র ১ টিই হবে, আর সেই একটি মাত্র কারেন্সিকে আলাদা আলাদাভাবে ১৯ টি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও দেয়া যায় না, তার চেয়ে বরং সবগুলো দেশের জন্য নতুন করে একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক বানানো হোক, যার কাজ হবে ইউরো ছাপানো বা বাজারে এর সরবরাহ নিয়ন্ত্রন করা। আগে থেকেই ইউরোপিয়ান মনেটরি ইন্সটিউট ছিল। মূলত সেটিকেই প্রতিস্থাপিত করা হয় ১৯৯৮ সালের পহেলা জুন ইউরোপিয়ান কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা ইসিবি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ফলশ্রুতিতে বিলুপ্ত হল দেশগুলোর নিজস্ব কারেন্সি, আর ব্যাপকভাবে ক্ষমতা হারালো দেশগুলোর নিজস্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো। আর ১ জানুয়ারী ১৯৯৯ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হল ইউরো।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর সংখ্যা ২৮ টি হলেও (ইউকে ইউ ত্যাগ করলে একটি কমবে), তার মধ্যে ১৯ টি দেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাদের একক কারেন্সি হিসেবে ইউরো ব্যবহার করার। তাই, ইসিবির প্রভাব মূলত এই ১৯ টি দেশের উপরেই। এই ১৯ টি দেশ হচ্ছে বেলজিয়াম, জার্মানি, এস্তোনিয়া, আয়ারল্যান্ড, গ্রিস, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, সাইপ্রাস, লাটভিয়া, লিথুয়েনিয়া, লাক্সেমবার্গ, মাল্টা, নেদারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, পর্তুগাল, স্লোভেনিয়া, স্লোভাকিয়া ও ফিনল্যান্ড। তবে বুলগেরিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, ডেনমার্ক, ক্রোয়েশিয়া, হাঙ্গেরিয়া, পোল্যান্ড, রোমানিয়া, সুইডেন ও ইউকে, এই নয়টি দেশ ইউরো ব্যবহার করে না। তারা তাদের নিজস্ব কারেন্সি ব্যবহার করে।

ইসিবির মূলধন

অন্যান্য ব্যাংকের ন্যায় ইসিবিরও নিজস্ব মূলধন ও শেয়ারহোল্ডার আছে। তবে, পার্থক্য হচ্ছে কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির বদলে এর মালিকানা সদস্যভুক্ত দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর এবং তা স্থানান্তরযোগ্যও নয়। ইসিবির বর্তমান মূলধন হচ্ছে ১১ বিলিয়ন ইউরো। ইউভুক্ত দেশগুলোই সম্মিলিতভাবে এর শেয়ারহোল্ডার বা মালিকানার অধিকারী এবং এই মূলধনের যোগান দিয়েছে। কোন দেশ ইসিবির কতটুকু মালিকানার অধিকারী হবে, তা নির্ধারিত হয় ওই দেশের জনসংখ্যা ও জিডিপি, ইউ এর সম্মিলিত জনসংখ্যা ও জিডিপি কতটুকু, তার উপর ভিত্তি করে। প্রতি পাঁচ বছর পর পর ইউ জনসংখ্যা ও জিডিপি পর্যালোচনা করে মালিকানার পরিমান হালনাগাদ করে। বর্তমানে ইসিবির সবচেয়ে বেশি মালিকানাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো হচ্ছে জার্মান ফেডারেল ব্যাংক (প্রায় ১৮ শতাংশ), ব্যাংক অফ ফ্রান্স (১৪.১৭ শতাংশ) ও ব্যাংক অফ ইটালি (১২.৩১ শতাংশ)। যেহেতু, প্রধান ৩ টি দেশই ইসিবির প্রায় ৪৪ শতাংশ মালিকানার অধিকারী, তাই ইসিবির অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারনে এই দেশগুলোর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। যেমন, ইসিবির বর্তমান প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন মারিও দ্রাঘি, যিনি পূর্বে ব্যাংক অফ ইটালির গভর্নর ছিলেন।

প্রশ্ন আসতে পারে, ইসিবির কার্যক্রম পরিচালিত হয় কিভাবে? যেহেতু, একক কোন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নয় এটি, এর পরিচালক এবং কর্মীরাই বা নির্বাচিত হয় কিভাবে?

ইসিবি পরিচালিত হয় সরাসরি ইউরোপিয়ান আইনের মাধ্যমে। এই আইনের মাধ্যমেই ঠিক হয় ইসিবির পরিচালক বা কর্মকর্তারা কিভাবে নির্বাচিত হবেন। এ কারনে ইসিবির পরিচালক বোর্ডে বিভিন্ন দেশের সদস্য রয়েছে।

ইসিবির সদরদপ্তর কোথায়?

প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে ইসিবির সদরদপ্তর ছিল ইউরো টাওয়ারে, যা পরে পরিবর্তিত হয়। ইসিবির বর্তমান সদরদপ্তর হচ্ছে জার্মানীর ফ্রাংকফুর্টে।

ইসিবির উদ্দেশ্য ও কার্যাবলী

ইসিবির সংবিধানেই উল্লেখ করা আছে এর প্রধান উদ্দেশ্য ও কার্যাবলী কি হবে। ইসিবির মূল লক্ষ্য একটাই। আর্টিকেল ২ তে উল্লেখ আছে যে, ইসিবির প্রধান উদ্দেশ্য হবে ইউরোজোনে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা। প্রতিষ্ঠাকালীন বছরেই সংস্থাটির গভর্নিং কাউন্সিল এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, মূল্য স্থিতিশীল রাখা বলতে বোঝাবে ইউরোজোনে মূল্যস্ফীতি শতকরা ২ শতাংশের নিচে ধরে রাখাকে। কিন্তু, মে ২০০৩ সালে আবার এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, ইসিবি মূল্যস্ফীতি শতকরা ২ শতাংশের নিচে কিন্তু ২ শতাংশের কাছাকাছি ধরে রাখার চেস্টা করবে।

ইসিবির প্রধান প্রধান কাজগুলো কি হবে, তা উল্লেখ আছে আর্টিকেল ৩ এ। ইসিবির মূল কাজগুলো হবে, ইউরোজোনের মনেটারি পলিসি কি হবে তা ঠিক করা এবং বাস্তবায়ন করা, ফরেন এক্সচেঞ্জ অপারেশন, ESCB (European System of Central Banks) এর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের দেখভাল করা ইত্যাদি। ইউরো ব্যাংকনোট শুধুমাত্র ইসিবিই ইস্যু করতে পারে। সদস্য দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কোন ইউরো নোট ইস্যু করতে পারবে না। তবে, তারা চাইলে শুধুমাত্র ইউরো কয়েন বাজারে ছাড়তে পারবে। তবে, শুধুমাত্র ইসিবির অনুমোদিত পরিমানেই কয়েন ইস্যু করতে পারবে। এ কারনেই ইউরো কয়েনগুলো ইউভুক্ত বিভিন্ন দেশে ভিন্ন হলেও ইউরো ব্যাংকনোট সব দেশেই এক রকম।

যে কারনে ইসিবি ফরেক্স ট্রেডারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ

দীর্ঘদিন ধরে ফরেক্স ট্রেড করছে অথচ কখনোই ইসিবির নাম কখনোই শোনেনি, এমন ফরেক্স ট্রেডার খুজে পাওয়া ভার। ইসিবির গুরুত্বপূর্ণ মীটিং, ইসিবি প্রধান মারিও দ্রাঘির বক্তব্য, ইসিবির মনেটারী পলিসি, এসবই ফরেক্স ট্রেডারদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর ইসিবির সুদের হার নির্ধারন সংক্রান্ত যেকোন বৈঠকের জন্য তো নিউজ ট্রেডাররা সবসময় অপেক্ষায় থাকে। ইসিবি সুদের হার বাড়ালে বা কমালে ইউরো বেইজড পেয়ারগুলো খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কয়েকশ পিপস মুভ করে।

যারা ফরেক্সে দীর্ঘমেয়াদে ট্রেড করেন, তারা ইসিবির মনেটারি পলিসির দিকে লক্ষ্য রাখেন যাতে সামনের দিনগুলোতে ইউরোর প্রাইস কিরকম থাকতে পারে, সে সম্পর্কে ধারনা পাওয়া যায়। ইসিবি যদি লক্ষ্য করে যে ইউরো দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়ে যাচ্ছে, তাহলে সুদের হার বাড়িয়ে ইসিবি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করবে, যেটা ইউরোকে শক্তিশালী করবে।

এক নজরে ইসিবি

নামঃ Europian Central Bank (ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক)

সদরদপ্তরঃ ফ্রাংকফুর্ট, জার্মানি

প্রতিষ্ঠাকালঃ ১ জুন, ১৯৯৮

প্রতিষ্ঠাকালীন প্রেসিডেন্টঃ ভিম ডুইজেনবার্গ (ডাচ তথা নেডারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট)

বর্তমান প্রেসিডেন্টঃ মারিও দ্রাঘি, ব্যাংক অফ ইটালির প্রাক্তন গভর্নর

মূলধনঃ ১১ বিলিয়ন ইউরো

রিজার্ভঃ ৫২৬ বিলিয়ন ইউরো

অন্যান্যঃ ইউরোপিয়ান ১৯ টি দেশের সম্মিলিত কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ইউরো নোটের একমাত্র ইস্যুকারী।

ওয়েবসাইটঃ www.ecb.europa.eu

হোম
নিউজ
ট্রেডিং স্কুল
ব্রোকার
সিগন্যাল
ক্লাব
Scroll to Top